প্রযুক্তি
রোবটেও আসছে চ্যাটজিপিটি বিপ্লব: ইউনিট্রি সিইও
রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মস্তিষ্ক এখন 'চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত' স্পর্শ করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনা হিউম্যানয়েড রোবট ইউনিকর্ন ইউনিট্রির সিইও।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেইজিংয়ে আয়োজিত এক রোবট সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।
সাংহাই পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির রেকর্ড আইপিও তালিকাভুক্তি এআই-চালিত যন্ত্রের বাজারে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে চীনের লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বেইজিংয়ের শক্তিশালী সমর্থনপুষ্ট এই সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। প্রথম দিনে প্রায় ছয় গুণ দাম বাড়ার পরদিনই, চীনের সবচেয়ে পরিচিত এই হিউম্যানয়েড রোবট প্রস্তুতকারক কোম্পানির শেয়ার দর ১১ শতাংশ কমেছে।
বেইজিংয়ে আয়োজিত এক রোবট সম্মেলনে ইউনিট্রির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ওয়াং সিংসিং বলেন, ‘এমবডিড ইন্টেলিজেন্স বা স্পর্শযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আমরা একটি ‘চ্যাটজিপিটি মুহূর্তের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
২০২২ সালের শেষের দিকে চ্যাটজিপিটির বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এআই বিপ্লব শুরু হয়েছিল, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আনে এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রযুক্তির ব্যবহার পৌঁছে দেয়। কিন্তু ওয়ার্ল্ড মডেল বা শারীরিক এআই সিস্টেমের ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো বড় বদল আসেনি।
ওয়াং জানান, ইন্ডাস্ট্রিটি এখন এমন এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের কাছাকাছি যেখানে রোবটকে সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো পরিবেশে ছেড়ে দিলেও সাধারণ ভয়েস বা টেক্সট কম্যান্ডের মাধ্যমে বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে একটি রোবটকে অচেনা কোনো পরিবারে নেওয়া হলে, এটি ভয়েস বা টেক্সট নির্দেশনার মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারবে। রোবট শিল্পে হঠাৎ বিশাল বিস্ফোরণ বা প্রবৃদ্ধির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হবে।’
একই সঙ্গে ওয়াং সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ‘আশাবাদী হিসেবে ভাবলে রোবটের সফটওয়্যারে বড় কোনো অগ্রগতি আসতে হয়তো দুই থেকে তিন বছর লাগবে, আর না হয় বড়জোর ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে।’
অটোমেশন ও রোবোটিক্স পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্টাইলারের প্রধান জর্জ স্টাইলার বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্সের উৎসবমুখর পরিবেশ এবং ইউনিট্রির দুর্দান্ত আইপিও তালিকাভুক্তির তুলনায় বর্তমান সক্ষমতার বিষয়ে ওয়াং সিং বেশ বাস্তবসম্মত মন্তব্য করেছেন।’
শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট্রি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোবট কুকুর উৎপাদক এবং চালানের দিক থেকে হিউম্যানয়েড বা মানব সদৃশ রোবটের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রস্তুতকারক।
চীনা টিভিতে কোরিওগ্রাফি করা রোবট নাচ এবং কুংফু পরিবেশন দেখিয়ে কোম্পানিটি প্রথম নজর কাড়ে। বর্তমানে তারা শিল্পকারখানার বাস্তব পরিবেশে রোবট মোতায়েন শুরু করেছে। তবে তাদের আইপিও প্রসপেক্টাস অনুসারে, তাদের বেশিরভাগ ক্রেতাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
চীনা রোবোটিক স্টার্টআপ গ্যালবট এর প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং হে বিশ্বাস করেন, ২০২৮ সালের মধ্যে এই খাতের চ্যাটজিপিটি মুহূর্ত চলে আসবে।
তার মতে, যখন কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই রোবটগুলো দৈনন্দিন কাজের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন করতে পারবে, সেটাই হবে সেই মুহূর্ত।
তিনি বলেন, ‘ডেটার ক্রমাগত সংগ্রহ এবং প্রযুক্তির আরও অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা আশা করছি ২০২৮ সালের মধ্যে এমবডিড ইন্টেলিজেন্সের চ্যাটজিপিটি মুহূর্তে পৌঁছাতে পারব।’
ইউনিট্রি-এর প্রধান ওয়াং জানান, অর্থ ও জনবলের দিক থেকে তাদের বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে ওয়ার্ল্ড মডেল প্রযুক্তিতে এবং বাস্তব ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল এআই মডেলের প্রয়োগের দিক থেকে তারা পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘হিউম্যানয়েডগুলো এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট সক্ষম নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এআই মডেলের সীমাবদ্ধতাই এই শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা।’
তা সত্ত্বেও এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং এআই ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর নিজে নিজে উন্নত হওয়ার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ওয়াং আশা প্রকাশ করেন যে, সামনের দশকে হিউম্যানয়েড রোবটগুলো দ্রুত স্বয়ংক্রিয় বিবর্তনের যুগে প্রবেশ করবে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের হিউম্যানয়েড ইন্ডাস্ট্রি বডি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই চীন চল্লিশহাজার এরও বেশি হিউম্যানয়েড সরবরাহ করেছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট সরবরাহের ৯৭ শতাংশ।
জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে শ্রমশক্তির ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চীনা সরকার আশা করছে, একঘেয়ে, কম মূল্যের এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের বিকল্প হিসেবে শেষ পর্যন্ত এই রোবটগুলোই ব্যবহার করা সম্ভব হবে। কারখানা এবং লজিস্টিকসের গুদামে হিউম্যানয়েড রোবটগুলো ধীরে ধীরে চালু করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো এখনো মানব কর্মীদের চেয়ে কম দক্ষ।
তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই হিউম্যানয়েড রোবট। গত মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিদেশে তৈরি হিউম্যানয়েড এবং চার পেয়ে রোবট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা চীনা উৎপাদকদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তবে বেইজিংয়ের ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্সে উপস্থিত বেশ কয়েকটি কোম্পানি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পথ খুঁজছে।