১৬ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার
অর্থনীতি

ছোট ব্রোকারদের দাপটে আটকে যাচ্ছে শেয়ারবাজার সংস্কার

Reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
25 August 2026, 10:36 AM
News Image
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের নির্বাচনের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছোট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক মানের সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক্সচেঞ্জটিতে ২৯২টি সক্রিয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৯টিই প্রাতিষ্ঠানিক। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো আগে একক মালিকানাধীন ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

ডিএসই সূত্র জানায়, লেনদেনের হিসাবে শীর্ষ ৪০টি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানই মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণির। ২০২৬ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে দৈনিক বাজার লেনদেনের ৭০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে সংখ্যায় কম হওয়ায় ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে তারা নিজেদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে পারছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সাবেক একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সিন্ডিকেট ডিএসইর পর্ষদে এমন প্রার্থীকে সমর্থন করে, যারা মূলত তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে কাজ করতে পারেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ও করপোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো সাবেক একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ভিন্ন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ডিএসইর পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বাজারে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ার পাশাপাশি নতুন পণ্য ও সেবা চালুর ক্ষেত্রেও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হবে।

ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী, ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদে মোট ১২ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন স্বতন্ত্র পরিচালক, চারজন শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির প্রতিনিধি, একজন কৌশলগত অংশীদারের প্রতিনিধি এবং ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকার বলে ১২তম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরা মূলত তাদের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র পরিচালকরাও বাজারে কার্যকরভাবে নিয়ম ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তেমন ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তাদের অনেকেই সম্মানী ও করপোরেট মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য পর্ষদে যুক্ত হন। আবার কারও কারও পুঁজিবাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাও সীমিত।

ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের সংস্কারবিরোধী অবস্থানের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) কার্যক্রম শুরু না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। গঠনের ছয় বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
সিসিবিএলে ডিএসইর ৪৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখনো নিবন্ধন করেনি ডিএসই। ফলে অন্য অংশীদারদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ কমে গেছে। কার্যক্রম শুরুর আগে সিসিবিএলকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে নিবন্ধিত হতে হবে।

বিএসইসি সূত্রের দাবি, সিসিবিএলের প্রস্তাবিত পরিচালনা পর্ষদে ডিএসইর পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি রাখার কথা ছিল। দুজনই স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়ার কথা থাকলেও ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরা এই কাঠামো মেনে নিতে রাজি হননি।

পুঁজিবাজারে দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু এবং নতুন ধরনের ডেরিভেটিভ পণ্য চালুর জন্য একটি কার্যকর ক্লিয়ারিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। সিসিবিএলের মূল দায়িত্ব হবে এক্সচেঞ্জের প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হওয়া লেনদেনের ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট নিশ্চিত করা, যাতে কোনো ধরনের ব্যর্থতা ছাড়াই লেনদেন নিষ্পত্তি করা যায়।

সিসিবিএল কার্যক্রম শুরু করলে বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে মার্জিন হিসাবে শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করাও সহজ হবে। তবে সিসিবিএল চালু হলে ডিএসইর ট্রেক-ধারী (ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট) ব্রোকাররা বর্তমানে পাওয়া ‘ফ্রি লিমিট’ সুবিধা আর ভোগ করতে পারবেন না। বর্তমানে কোনো ধরনের মার্জিন জমা না দিয়েই ব্রোকাররা সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারেন।

এদিকে অধিকাংশ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এখনো মূলধন পর্যাপ্ততার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততা বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ধরন অনুসারে ব্রোকারদের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক মূলধনের প্রয়োজন ৫ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা।
ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ছোট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নির্ধারিত মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত পূরণ করা সম্ভব নয়।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত মূলধন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে পরিচালনাগত ও বাজার ঝুঁকিজনিত লোকসান সামাল দেওয়া, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তির সময় ব্রোকারের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ কিংবা শীর্ষ ১০ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ডিএসইর পর্ষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরিচালক হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি।

তিনি বলেন, পেশাদার ব্রোকারদের পক্ষে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য লবিং করা সম্ভব নয়। তাই তারা নির্বাচনের বদলে নিজেদের ব্যবসায় মনোযোগ দেন। সাইফুল ইসলাম একই সঙ্গে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।