১৫ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার
বিশেষ প্রতিবেদন

মাদকের থাবায় বাড়ছে সহিংসতা, শঙ্কায় সমাজ

Reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
25 August 2026, 10:53 AM
News Image
সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। এই মরণনেশার ভয়াবহতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মাদককে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই ঘটছে নানা অপরাধ। হামলা, মারামারি ও ছিনতাইয়ের মতো বিভিন্ন সহিংসতার পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। অথচ সেই তুলনায় মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি রংপুরে বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ রূপ কেবল ঘরের বাইরেই নয়, বরং পারিবারিক গণ্ডির ভেতরও তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে সন্তান তার মা-বাবাকে কিংবা ভাই তার আপন বোনকে খুন বা জখম করতেও দ্বিধা করছে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সর্বস্তরে মাদক ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনই যদি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হয়, তবে আগামীতে এর ভয়াবহতা মোকাবিলায় কোনো পথ অবশিষ্ট থাকবে না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা মাদকাসক্ত, তারা আশঙ্কাজনকভাবে হিংস্র হয়ে ওঠে। মাদক সেবনের কারণে তাদের হিতাহিত কোনো জ্ঞান থাকে না, এতে একজন মাদকসেবী ভয়াবহ অপরাধ করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

গত শনিবার দিবাগত রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

এ ঘটনায় গত রবিবার ভোরে নগরীর দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় ওই শিক্ষকসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে প্রতিবেশী দুই যুবক। অন্যদিকে স্থানীয় ও পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকারীরা মাদকাসক্ত। তবে শুধু মাদকের জেরে নয়, গণপতি চক্রবর্তীর নতুন বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবি নিয়ে বিরোধের জেরেও পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গ্রেপ্তার দুজন সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন এবং সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানের কারিগর। দুজনে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর পাশের বাড়িতে থাকেন। তারা বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীব রাতে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে নিহতদের বাড়ির ছাদে ওঠেন এবং সেখানে ইয়াবা সেবন করতে শুরু করেন। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে প্রার্থী ছুটে গেলে সিঁড়িতে তাদেরও একইভাবে হত্যা করা হয়। পরে ঘুমন্ত শিশু প্রিয়মকে কাপড় ও বালিশচাপায় শ্বাসরোধে হত্যা করেন দুজন। হত্যার পর অভিযুক্তরা গোসল করেন, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খান এবং অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন। ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন এবং আঙুলের ছাপ মুছতে মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পানিতে ভিজিয়ে রাখেন, যাতে পুলিশ মনে করে–এটি ডাকাতির ঘটনা।

শুধু রংপুর নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেও মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত ২২ আগস্ট, শনিবার রাতে রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার মেহেরচণ্ডী উত্তরপাড়ায় নেশার টাকার জন্য মা ও ছোট ভাইকে ধারালো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছেন মাদকাসক্ত এক যুবক। অভিযুক্ত মেহেদী হাসান ওরফে মুন্নাকে (৩৪) স্থানীয়রা পিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে আহত তিনজনকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। এর আগে ১৪ আগস্ট শুক্রবার ঝিনাইদহের মহেশপুরে মাদকাসক্ত ইখলাসুর রহমান (৩৮) তার মাকে গলা কেটে হত্যা করেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, মাদক সেবনের টাকা না দেওয়ায় মায়ের সঙ্গে তার ঝগড়া-বিবাদ হয়। এর জেরে ইখলাসুর মায়ের কক্ষে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করেন।

গত ৭ আগস্ট রাত ১১টার দিকে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ইস্ট বেঙ্গল মার্কেটের ভেতর কয়েকজনকে মাদক সেবনে বাধা দিলে মিতুল ইসলাম (১৮) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত রাহিম আহম্মেদ রাফিসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধান আসামি রাফি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

হাত বাড়ালেই মিলছে মাদকদ্রব্য
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে মাদকদ্রব্য। হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক। বিভিন্ন এলাকার বস্তিগুলোতে প্রকাশ্যে বা গোপনে চলছে মাদকের কারবার। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পৌঁছে দিচ্ছে মাদক কারবারিরা।

এদিকে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানও চলছে। প্রতিদিন মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগে অসংখ্য আসামিকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। মাদকদ্রব্য জব্দসহ অনেক চোরাকারবারিকেও ধরা হচ্ছে। তবু থেমে নেই মাদকের কারবার। সহজলভ্য হওয়ায় মাদকের বিস্তার হয়েই চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অনেক মাদক দেশে ঢুকছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গত সাত মাসে সারা দেশে মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে ৩৯ হাজার ১০৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মহানগরীগুলোর মধ্যে ঢাকায় ৩ হাজার ৪২৬ জন, চট্টগ্রামে ১ হাজার ২৭৯, খুলনায় ৩৪৮, রাজশাহীতে ৫৭৩, বরিশালে ৩৫০, রংপুরে ৩৮৩, গাজীপুরে ৯৫৩ ও সিলেটে ৩৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর এবং রেলওয়ে রেঞ্জ এলাকা থেকে বাকি ৩৩ হাজার ৪৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিন্দুমাত্র ছাড় নয়। মাদকের কারবার, বহন ও সেবনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

দেশজুড়ে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, ডাকাতি, নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধ ঘটছে। এসবের পেছনে মাদকের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনেক হত্যাকাণ্ড বা সংঘাত সহিংসতার ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক। মাদক বিক্রি ও সেবনে বাধা দেওয়ায় মাদকাসক্তদের আক্রমণে অনেক স্থানে হত্যা অথবা সহিংসতা ঘটছে। তিনি বলেন, বর্তমানে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখনই মাদকের লাগাম টানতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে কিন্তু মাদক থেকে অসংখ্য সামাজিক অস্থিরতা-হত্যা-নৈরাজ্য সৃষ্টির ঘটনাগুলো ঘটবে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো সামর্থ্য একসময় আমাদের থাকবে না। মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ সমাজের সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবোধ গড়ে তুলতে হবে।

মাদকের কুফল সম্পর্কে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, মাদক সেবনে মানুষের অপূরণীয় শারীরিক-মানসিক ক্ষতি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় তা প্রমাণিত। কিন্তু শুধু শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিতেই মাদকের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ নয়। মাদক সেবনের ফলে সম্ভাব্য দক্ষ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশের মেধা ও কর্মক্ষমতার অপচয় হয়। বর্তমান সময়ের তারুণ্যের একটি বড় অংশের সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ মাদকের বিস্তার। মাদক স্বাভাবিক বিবেক ও ন্যায়-অন্যায় বোধের বিলুপ্তি ঘটায়, ফলে মাদকসেবীরা ধর্ষণ-হত্যার মতো অপরাধ করতেও দ্বিধা করে না।