বিশেষ প্রতিবেদন
সিদ্ধান্তহীনতার অদৃশ্য মাশুল
২০২১ সালে এক বন্ধু দুবাইয়ে একটি অ্যাপার্টমেন্ট না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোভিড-পরবর্তী মন্দা কাটিয়ে তখন বাজার কেবল ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এই উন্নতি স্থায়ী হবে। তিনি এটাকে স্রেফ সাময়িক পুনরুদ্ধার মনে করেছিলেন।
২০০৮ সালের ধসের কথা তখনও সবার মনে স্পষ্ট ছিল। তাই তিনি ঠিক করলেন আরও এক বছর ভাড়া থাকবেন, দেখবেন এই বাজার চাঙ্গা ভাব ধরে রাখতে পারে কি না, এবং পরিস্থিতি পরিষ্কার হলে তারপর কিনবেন।
তিনি আজও ভাড়ায় আছেন। প্রতি বসন্তে বাসা নবায়নের নোটিশ আসে এবং আরও বেশি টাকা দাবি করে। যে অ্যাপার্টমেন্টটি তিনি হাতছাড়া করেছিলেন, তার দাম আজ বহুগুণ বেড়েছে। আর যে ডাউনপেমেন্টের টাকাটা তিনি জমিয়েছিলেন, তা কিস্তিতে কিস্তিতে অন্য কারো পকেটে চলে গেছে। প্রকাশ্যে আঙুল তুলে দেখানোর মতো কোনো ভুল তিনি করেননি। তিনি কেবল একই ছোট সিদ্ধান্ত বারবার নিয়েছেন। এখনই নয়, আরও কিছুদিন পর।
সাবধান হওয়াটা তার ভুল ছিল না। তার ভুল ছিল এটা ধরে নেওয়া যে, সাবধান হওয়ার কোনো মাশুল দিতে হয় না।
আমাদের ধৈর্যকে সম্মান করতে শেখানো হয়। বলা হয় ভালো কিছু হতে সময় লাগে, উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করো। এটি বেশ যুক্তিযুক্ত পরামর্শ, এবং আমি নিজেও এমন পরামর্শ দিয়েছি এক প্রান্তিকে খারাপ ফলাফলের কারণে চাকরি ছাড়তে উদ্যত হওয়া কোনো সহকর্মীকে, কিংবা কেবল প্রতিযোগী আগে ঢুকে পড়েছে বলে হুট করে নতুন বাজারে নামতে চাওয়া কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে। সব নৌকায় আমাদের উঠতে নেই।
কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে, ধৈর্যশীল প্রস্তুতি আর নিষ্ক্রিয় বিলম্ব এই দুটির পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত কঠিন। ধৈর্য হলো সক্রিয়। এটি পর্যবেক্ষণ করে, শেখে এবং নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। যাতে সঠিক মুহূর্তটি এলে তা আঁকড়ে ধরা যায়। পক্ষান্তরে বিলম্ব দেখতে হুবহু একই রকম মনে হলেও, সে আসলে এর কোনো কাজই করে না। বিলম্ব হলো সতর্কতার মুখোশ পরা ভয়, বিশ্লেষণের নামে সিদ্ধান্তহীনতা এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে চলার প্রবণতা। এটি আমাদের এত স্বস্তি দেয় কারণ এটি আমাদের কাছ থেকে কোনো পরিশ্রম দাবি করে না। সিদ্ধান্ত নিলে দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। আর অপেক্ষা করলে আমরা এই ভেবে নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারি যে সব বিকল্প এখনও তো আমার হাতেই আছে।
কিন্তু বিকল্প বা সুযোগগুলোর মেয়াদ একসময় ফুরিয়ে যায়, আর সে কথা তারা কখনো বলে আসে না।
ইউএইতে যখন কর্পোরেট কর চালু করা হলো, তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছিল কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক বছর সময় দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠন, চুক্তির মূল্য পুনর্বিবেচনা এবং অতীতের নথিপত্র ঠিকঠাক করে নিতে পারে। অনেকেই এই সময়টিকে কেবল অপেক্ষা করে নষ্ট করেছে। প্রতিটি ধাপেই তাদের যুক্তি ছিল নিখুঁত। নির্দেশিকা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত নয়, আর প্রযুক্তিগত সিস্টেম তো পরেও আপডেট করা যাবে। ফলস্বরূপ, যখন সময়সীমা একদম ঘাড়ের ওপর চলে এলো, তখন দুই বছরের কাজ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কয়েক গুণ বেশি খরচে শেষ করতে হলো।
ক্যারিয়ারও ঠিক একই পথ অনুসরণ করে। কেউ একজন কাজের স্বীকৃতির আশায় নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে, মনে করে অনুগত থাকলে একদিন নিশ্চয়ই পুরস্কৃত হবে; অন্যদিকে সহকর্মীরা নতুন সুযোগ চেয়ে নেয় এবং দক্ষতা অর্জন করতে থাকে। কিছু সময়ের জন্য এই ধৈর্যকে ‘পরিপক্কতা’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমা পার হয়ে গেলে, তা আসলে নিজের ক্যারিয়ারের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
সমস্যার মূল কারণ হলো, আমরা হিসাবের কেবল একটি দিক পর্যবেক্ষণ করি। কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা তার ঝুঁকিগুলো খুঁটিয়ে দেখি। যদি ভুল হয়? যদি আমি তৈরি না থাকি?। কিন্তু অপেক্ষা করার ঝুঁকিগুলো আমরা প্রায় কখনোই খতিয়ে দেখি না আরেক বছর পর কোন কাজটা আরও কঠিন হয়ে যাবে?, কোন সুযোগগুলো চুপচাপ হারিয়ে যাবে?, আমি যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে বসে আছি, তখন অন্যরা কী অর্জন করে ফেলবে?, আমি যে নিখুঁত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছি, বাস্তবে কি আদৌ তার অস্তিত্ব আছে?
এই প্রশ্নগুলো আপনার অনিশ্চয়তা দূর করবে না, তবে বিলম্ব করার পেছনে আসল খরচটা কত তা স্পষ্ট করে তুলে ধরবে; আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সেটাই সাধারণত যথেষ্ট।
আমরা সঠিক মুহূর্ত বিষয়টিকে রূপকথার মতো বানিয়ে ফেলেছি। আমরা কল্পনা করি, এটি এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণ যখন আত্মবিশ্বাস, সুযোগ, সম্পদ এবং নিশ্চিতকরণ সব একসূত্রে এসে মিলবে। কিন্তু বাস্তবে, বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তখনই নেওয়া হয়, যখন এর দু-একটি উপাদান উপস্থিত থাকে। মানুষ সব প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই ব্যবসা শুরু করে দেয়; নিজেকে পুরোপুরি যোগ্য মনে হওয়ার আগেই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করে। কাজ করার আগে প্রস্তুতি নিজে থেকে তৈরি হয় না; বরং আমরা কাজে নেমে পড়ি বলেই কাজের উপযোগী প্রস্তুতি গড়ে ওঠে।
এটি আমাদের সামনে তৃতীয় একটি বিকল্প তুলে ধরে, যা আমরা খুব কমই ব্যবহার করি। আমরা যেকোনো বিষয়কে কেবল দুটি সমীকরণে দেখি কাজ করো, অথবা অপেক্ষা করো। অথচ আমরা যে কোনো কিছু প্রত্যাখ্যান করে সেই অধ্যায়টি চিরতরে বন্ধও করে দিতে পারি, সে কথা আমরা ভুলে যাই। আমার সেই বন্ধু ২০২১ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারতেন যে ফ্ল্যাট কেনা তাঁর জন্য নয়, এবং প্রতি বছর চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সেই একই প্রশ্ন নতুন করে তোলা বন্ধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখলেন; আর এমন অমীমাংসিত ফাইল প্রতি বসন্তেই মনোযোগ আর মানসিক শক্তি দাবি করে।
যে সিদ্ধান্ত বাতিল করে চূড়ান্ত করা হয়েছে, তার জন্য অতিরিক্ত কোনো মাশুল দিতে হয় না। কিন্তু যে সিদ্ধান্ত অনাদিকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়, তা মনোযোগ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের রূপ ধরে নিজস্ব এক ভাড়া উসুল করতে থাকে। কোনো কিছু না করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সাহসের অভাব নয়; বরং তা সিদ্ধান্তহীনতার পেছনে অপচয় হওয়া শক্তিকে ফিরিয়ে আনে। পেছন টেবিলে এক ডজন বিষয় ঝুলিয়ে রাখা সতর্কতার লক্ষণ নয়; এটি আসলে কোনো বিষয়টিতেই পুরোপুরি মনোযোগী না হতে পারার একটি উপায়।
সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাও এক ধরনের সিদ্ধান্ত। এটি স্রেফ অলসতা বা স্বাভাবিকতায় ঘটে যাওয়া এক সিদ্ধান্ত, আর এমন অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত আমাদের খুব কমই উপকারে আসে। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ভুল পদক্ষেপে হয় না; বরং আক্ষেপ হয় এটা ভেবে যে নিশ্চিত হওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে করতে আমরা সেই মুহূর্তটিই হারিয়ে ফেলেছি, যখন সুযোগটি আসলেই আমাদের হাতে ছিল।