বিনোদন
১২৫০ ঘণ্টার অ্যাটেলিয়ার শিল্পে ভেনিস মাতালেন ভাবিতা মান্ডাভা
ভাবিতা মান্ডাভা, ৯ মাস আগে, ফ্যাশন জগতের বাইরের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এই নামটি একপ্রকার অচেনাই ছিল। কিন্তু এ সপ্তাহে তিনি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে হেঁটেছেন চ্যানেলের এমন একটি গাউন পরে, যা এমব্রয়ডারি করতে অ্যাটেলিয়ারের সময় লেগেছে ১ হাজার ২৫০ ঘণ্টা।
ভারতের হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণকারী এই মডেল উৎসবটির ৮৩তম সংস্করণে ভেনিসে নিজের অভিষেক করেন।
তিনি শিনিয়া সুকামোতোর সিনেমা 'মি. নেলসন, ডিড ইউ কিল পিপল' এর প্রিমিয়ারে চ্যানেলের রিসোর্ট ২০২৭ কালেকশনের সমাপনী পোশাকে হাজির হন। সচরাচর এই ধরনের সুযোগ অর্জন করতে মডেলদের এক দশক লেগে যায়।
অ্যাকুয়া এবং টারকোয়েজ (ফিরোজা) রঙের এই পোশাকটি ডিজাইন করেছেন চ্যানেলের আর্ট ডিরেক্টর ম্যাথিউ ব্লেজি। এতে রয়েছে গাঢ় ও হালকা শেডের ৩০ হাজারটি গম্বুজাকৃতির হৃদপিণ্ড-আকৃতির সেকুইন। এছাড়া পেছনে ও নিচের অংশের ঝুলন্ত ফ্লাউন্সে রয়েছে আরও ৯৬ হাজারটি ডিম্বাকৃতির সেকুইন।
চ্যানেলের লেসেজ অ্যাটেলিয়ার কেবল এই এমব্রয়ডারির পেছনেই প্রায় ১ হাজার ২৫০ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছে।
এই নকশার উদ্দেশ্য ছিল সুনির্দিষ্ট। কালার গ্র্যাডিয়েন্ট বা নীল রঙের শেডগুলোর মাধ্যমে পানির ওপর আলোর খেলা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। আর পেছনের ও নিচের ফ্লাউন্সগুলো এমনভাবে সেলাই করা হয়েছে যা দেখলে মনে হয় যেন পানির নিচ থেকে কোনো শামুক বা ঝিনুক ভেসে উঠছে।
পোশাকটির সঙ্গে মান্ডাভার বাকি সাজগোজ ছিল বেশ মার্জিত ও পরিমিত। নীল ও সবুজ সেকুইনের একটি ক্যামেলিয়া ব্রোচ, গোল্ড-টোন মেটাল ও লাল রেজিনের কানের দুল, আর পায়ের রুপালি রঙের স্ট্র্যাপি স্যান্ডেল যার বেশিরভাগই পোশাকের ঘেরে ঢাকা পড়েছিল। চুলে ছিল একদম সোজা ও পরিপাটি ভাব। কোনো অতিরিক্ত গয়না বা জটিল হেয়ারস্টাইল ছিল না।
রেড কার্পেটে তার আগের অভিজ্ঞতাটি অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের ছিল।
২০২৬ সালের মেট গালায় মান্ডাভা যখন এসেছিলেন, তখন এক নজরে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি সাধারণ একটি কোয়ার্টার-জিপ জাম্পার এবং জিন্স পরেছেন। সোশাল মিডিয়া তার প্রতি খুব একটা সদয় ছিল না; অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি পরার মতো হয়তো কোনো পোশাকই খুঁজে পাননি।
তবে সেই পোশাকটি ছিল সিল্ক অর্গানজা দিয়ে তৈরি কাস্টম চ্যানেল কালেকশন। সিল্ক অর্গানজা এমনই এক কাপড় যা অত্যন্ত হালকা হওয়ায় নিখুঁতভাবে কাজ করা বেশ কঠিন।
তারচেয়েও বড় কথা, এই পোশাকটি ছিল সরাসরি একটি স্মৃতির পুনর্নির্মাণ। ২০২৪ সালে ব্রুকলিনের অ্যাটলান্টিক টার্মিনাল স্টেশনে যখন '২৮মডেলস' এর এক স্কাউট তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন মান্ডাভার গায়ে ঠিক এই পোশাকটিই ছিল।
ব্লেজি অবশ্য এই রেফারেন্সটি আগেই এক বার ব্যবহার করেছিলেন। ডিসেম্বরের ২০২৫-এ নিউইয়র্কের এক পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে চ্যানেলের 'মেতিয়ের দা'শো-এর উদ্বোধনীতে তিনি মান্ডাভাকে বেজ রঙের কোয়ার্টার-জিপ এবং স্টোনওয়াশড জিন্স পরিয়েছিলেন।
সেই শো-তে হেঁটে প্রথম ভারতীয় মডেল হিসেবে চ্যানেলের শো উদ্বোধন করার গৌরব অর্জন করেন মান্ডাভা। ফ্যাশন জগতের নিয়মানুসারেও এই মাঝের কয়েকটি মাস অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে কেটেছে।
গত জানুয়ারিতে চ্যানেলের স্প্রিং হপ কুত্যুরশোতে কনে সেজে ইভেন্টটি সম্পন্ন করেন মান্ডাভা। এরপরই ব্রিটিশ ভোগ এবং আই-ডি-র প্রচ্ছদে তার ছবি আসে। বসন্তে চ্যানেল তাকে ব্র্যান্ডটির 'হাউস অ্যাম্বাসেডর' হিসেবে ঘোষণা করে।
বুদ্ধিমতী, মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ, যার মধ্য থেকে এক গভীর আনন্দের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে, মান্ডাভাকে অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ঘোষণার বিবৃতিতে বলেন ব্লেজি।
মান্ডাভাও জবাবে বলেন, ব্লেজির ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচালনা করার ধরণটা এমন- যা ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় রেখে নতুনত্ব নিয়ে আসে। এই অ্যাম্বাসেডর হতে পেরে তিনি নিজেকে সম্মানিত বোধ করছেন।
এর কোনো কিছুই অবশ্য আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল না। তিনি পড়াশোনা করছিলেন প্রথমে ভারতে আর্কিটেকচার, তারপর এনওয়াইইউতে মাস্টার্স। মে ২০২৫-এ যখন তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন, ততদিনে বোতেগা ভেনিতা, দিওর এবং চ্যানেলের মতো ব্র্যান্ডের হয়ে হাঁটার পাশাপাশি তার ঝুলিতে দুটি ডিগ্রি জমা হয়ে গেছে। সেই স্কাউট যখন প্রথম মডেলিংয়ের প্রস্তাব দেন, তখন মান্ডাভার প্রথম উত্তর ছিল 'না'। কিন্তু যখন পড়াশোনার ঋণের বিষয়টি সামনে আসে, তখন তিনি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন।
মেট গালার আগে 'ব্রিটিশ ভোগ'-এর সঙ্গে কথা বলার সময় মান্ডাভা বলেন, তিনি এসব মুহূর্তগুলো বিশ্লেষণ না করে বরং সেই মুহূর্তগুলোতে সম্পূর্ণ মগ্ন থাকার চেষ্টা করেন। কারণ কিছু অভিজ্ঞতা সময় নিয়ে উপলব্ধি করলেই কেবল তার সঠিক অর্থ বোঝা যায়।
তবে নিজের এই পরিচিতি অন্যদের জন্য কী ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে তিনি বেশ সোচ্চার। মে মাসে একই ম্যাগাজিনের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, তরুণ সাউথ এশিয়ান বা বাদামি রঙের ত্বকের মেয়েরা যখন তাকে দেখে, তখন তারা নিজেদের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখতে পায়। কারণ তিনি নিজের জীবন থেকেও ঠিক এই জিনিসটাই উপলব্ধি করেছেন।
আমি শুধু সততার সঙ্গে এবং পুরোপুরি নিজের সত্তা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে চাই, ম্যাগাজিনটিকে বলেন মান্ডাভা।