ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর কেটে গেছে ৯ মাস। মাটি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নকশাও জমা দিয়েছে। কিন্তু বরিশালের মুলাদী ও বাবুগঞ্জের মাঝখানে আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর বহুল প্রতীক্ষিত মীরগঞ্জ সেতুর নির্মাণকাজ এখনো মাঠে গড়ায়নি। নকশা অনুমোদন ও ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় থমকে আছে প্রকল্পের মূল কাজ।
অথচ চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে সেতু, সংযোগ সড়ক ও নদী শাসনের কাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। সেই লক্ষ্যে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মীরগঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তখন চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নির্মাণকাজ শুরুর কথা জানানো হয়েছিল। তবে সেই সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সেতুর কোনো দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
মুলাদীর বাসিন্দা আক্কাস শিকদার বলেন, ‘৯ বছর ধরে শুনছি আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর সেতু হবে। ৯ মাস ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাথর দেখছি। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।’ হিজলার রব মিয়া বলেন, ‘মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দারা মীরগঞ্জ সেতুর অপেক্ষায় রয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে সেতুর প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এখন আমরা সেতুর বাস্তব নির্মাণকাজ দেখতে চাই।’
সড়ক ও জনপথের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সেতুটির গুরুত্ব বাড়ছে। ভোলাকে বরিশালের সঙ্গে যুক্ত করার নতুন পরিকল্পনায় মীরগঞ্জ সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি রয়েছে।
সওজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর একনেক সভায় মীরগঞ্জ সেতুর প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রায় ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৮৪ মিটার। এর মধ্যে মূল সেতু ৫৪৪ মিটার এবং ভায়াডাক্ট ৯৪০ মিটার। দুই প্রান্তে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি নদীর তীর রক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ, টোলপ্লাজা, সড়কবাতি, ড্রেন, ফুটপাত ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পায়রা সেতুর আদলে কেবল-এক্সট্রাডোজড ধরনের এই সেতু নির্মাণে চীনের চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সয়েল টেস্ট শেষ করে গত আগস্টে নকশা অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে। নকশাটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই করছে। পরে নকশা প্রণয়ন কমিটির অনুমোদন পেলেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা জানিয়েছেন, শুধু নকশা নয়, ভূমি অধিগ্রহণ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য মুলাদী ও বাবুগঞ্জ অংশে প্রায় ২১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠিয়েছে সওজ। জমির মালিকানা নিয়ে কিছু আপত্তি ও অভিযোগ থাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে জমি অধিগ্রহণ কাজ কবে নাগাদ শুরু করা যাবে, তা বলতে পারছেন না জেলা প্রশাসকের অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তারা।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সহকারী কমিশনার মুহাম্মদ শাফিনুর রহমান আকন্দ বলেন, ‘মুলাদী ও বাবুগঞ্জ অংশে প্রায় ২১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। ওই প্রস্তাবনার যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ওই জমির মধ্যে কিছু জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। কোনো কোনো জমি নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। তবে সেটা কতদিন লাগবে, তা বলা যাচ্ছে না।’
বরিশাল সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদ খান বলেন, নকশার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে নকশা অনুমোদনের আশা করা হচ্ছে। এরপর ডিসেম্বরেই সেতুর নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হবে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারহানা হুসনা বলেন, নকশা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াগুলো শেষ হলে কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘নকশার অনুমোদন পাওয়ার পর মূল সেতু নির্মাণ শুরু করতে সমস্যা নেই। জমির প্রয়োজন বিকল্প ও সংযোগ সড়কের জন্য। আশা করি, জমি অধিগ্রহণের কাজটি সময়মতো শেষ হবে।’